ভূমিকা:
বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এক কালজয়ী কথাকার। বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তরের আবহ তাঁর লেখকসত্তাকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি বলেই কালজয়ী। কারণ বিভূতিভূষনের সৃষ্টিকাল ১৯২১ থেকে ১৯৫০ এর মধ্যবর্তী সময়, যে সময় ভারতবর্ষ তথা বিশ্ব-আকাশ চরম দুর্যোগের মেঘে আচ্ছন্ন। যে সময়ে পরপর সংঘটিত হচ্ছিল অসহযোগ আন্দোলন, আইন অমান্য আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, বঙ্গদেশে দুর্ভিক্ষ, জাপানে পারমানবিক বোমা বিস্ফোরণ, দাঙ্গা, দেশভাগ প্রভৃতির মতো নানা ঘটনা। আর তখন মানুষেরই লালসা-জাত দৈত্য চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছিল মানব অস্তিত্বকে। তখনই চরম আত্মবেদনা নিয়ে রবীন্দ্রনাথকে বলতে হয়েছিল – ” সেদিন ভারতবর্ষের জনসাধারণের যে নিদারুণ দারিদ্র্য আমার সম্মুখে উদ্ঘাটিত হল তা হৃদয় বিদারক। অন্ন, বস্ত্র, পানীয়, শিক্ষা, আরোগ্য প্রভৃতি শরীর ও মনের পক্ষে যা কিছু অত্যাবশ্যক তার এমন নিরতিশয় অভাব বোধ হয় পৃথিবীর আধুনিক শাসন-চালিত কোনো দেশেই ঘটে নি…।”
বিভূতিভূষণ এই বিপর্যস্ত সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাঁর সাহিত্য সাধনা সম্পর্কে আমাদের জানান- “…সাহিত্য শুধু রসবিলাস নয়। জীবনের দুঃখ, পরাজয় ও ব্যর্থতার দিনে যে সাহিত্য-রসিক পাঠক অচঞ্চল থাকেন, দারিদ্রের মধ্যেও যিনি নিজেকে হেয় জ্ঞান না করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার সাহস রাখেন, সাহিত্য নিয়ে নাড়াচাড়া তাঁর সার্থক। জীবন সমস্যাগুলির সমাধানের গূঢ় প্রেরণা যে সাহিত্যে তার মধ্যে আমরা পাব কলালক্ষ্মীর কল্যাণতম মূর্তিটির সন্ধান। “
তাই দেখা যায়, কোনও নেতিবাদ, নৈরাশ্য নয় বরং অনড়, অটল বিশ্বাস নিয়েই বিভূতিভূষণ মানুষের সহযাত্রী হয়ে উঠেছেন, খুঁজে নিয়েছেন সেই জীবনকে, যে জীবন কঠিন শিলার তলদেশ থেকেও সহজ জীবনরস আহরণ করতে সচেষ্ট থাকে। মানুষের অন্তর্লোক আবিষ্কারের যে অভিযানে তিনি নেমেছিলেন তারই উপলব্ধিতে গড়ে উঠেছে তাঁর অজস্র গল্প ও উপন্যাস। সুদিন-দুর্দিন, ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখের মিশ্রণে বয়ে চলে যেসব সাধারণ মানুষের জীবন, সেইসব অখ্যাত জীবনের বিচিত্র রূপকে আন্তরিক দরদ দিয়ে ভাষায় গ্রথিত করেছেন বিভূতিভূষণ। লক্ষ্য করলে তাদেরকে আজও গ্রাম বাংলার অলি-গলিতে অনায়াসেই খুঁজে পাওয়া যায়। কর্মসূত্রে বাংলা, আসাম ও বিহারের প্রত্যন্ত অঞ্চল গুলোতে ঘুরে বেড়াতে হয়েছিল বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। ফলে গ্রাম্য পরিবেশ ও গ্রাম্য জীবনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় ঘটেছিল। এজন্যেই বিভূতি সাহিত্যে পাওয়া যায় গ্রাম বাংলার বিচিত্র জীবনের ছবি। অতি সাধারণদের তিনি অসাধারণ করে তুলেছেন। তাদের দান করেছেন অমরতা। ঔপনিবেশিক সময়ে মহাযুদ্ধ, মন্বন্তরের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার ছবি নয়, কল্লোলীয় দেহসর্বস্বতা নয়- অতি সাধারণের জীবনে অন্ধকার থেকে উত্তরণের যে প্রক্রিয়া চলতে থাকে ক্রমাগত, কিংবা যারা প্রয়াস চালিয়ে যায়, বিভূতিভূষণের গল্পবিশ্ব জুড়ে রয়েছে সেইসব বিচিত্র জীবনের ছবি।

মূল আলোচনা:
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৯টি গল্পগ্রন্থের অন্তর্গত বহু ছোটগল্পের মুখ্য চরিত্র শিশু কিংবা কিশোর-কিশোরী। যারা অকৃত্রিম, সম্ভাবনাময় এবং লেখকের লোকায়ত ও লোকোত্তর জীবন ভাবনার পরিচয় বাহক। যাদের মধ্যে আমাদের আলোচ্য ‘পুঁইমাচা’ গল্পের প্রধান চরিত্র ক্ষেন্তি ও অন্যতম।
‘পুঁইমাচা’ গল্পের প্রধান চরিত্র কিশোরী ক্ষেন্তি। গল্পটিতে ক্ষুধার চিত্র আছে। যে পরিবারে বিবাহযোগ্য কন্যা রয়েছে সেই পরিবারের প্রতি এবং কন্যাদায়গ্রস্থ পিতার প্রতি সমাজের যে দৃষ্টিভঙ্গি তারও পরিচয় আছে। আছে একুশ শতকেও বর্তমান যে জলন্ত সমস্যা, যা অকালেই উজাড় করে দেয় হাজারো জীবন-স্বপ্ন, সেই পণপ্রথার কথাও। কিন্তু এই সবকিছুকে যেন আমরা ভালো করে উপলব্ধি-ই করতে পারি না। কারণ, নিজের অজান্তেই আমাদের সমস্ত হৃদয় জুড়ে নেয় সেই খাবারলোভী, কিছুটা অবোধ কিন্তু প্রাণবন্ত বালিকাটির সরলতা।
দরিদ্র পিতা-মাতা সহায়হরি চাটুয্যে ও অন্নপূর্ণার পাঁচ সন্তানের মধ্যে বড় মেয়েটি চৌদ্দ-পনেরো বছরের, নাম ক্ষেন্তি। সরল, কিছুটা নির্বোধ কিন্তু প্রাণবন্ত। ক্ষুধাকে হার মানানোর চেষ্টায় কিংবা নির্বোধতার কারণে খাবার যোগ্য- অযোগ্য বিচার না করেই এটা সেটা যেখানে যা পায় কুঁড়িয়ে আনে। মায়ের বকুনি খেয়ে বিমর্ষ ও দুঃখিত হলেও পরমূহুর্ত্তেই আবার মায়ের হাতের আমসত্ত্ব খাওয়ার লোভে হাত পেতে বলে- “মা, বলব একটা কথা ? ঐ কোণটা ছিঁড়ে একটুখানি…।”
শুধু খাদ্যের অভাব নয়, শীতের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য প্রয়োজনীয় কাপড়ের ও অভাব ক্ষেন্তির। কিন্তু পিতার সামর্থ্য নেই নতুন জামা কিনে দেবার, এটা সে জানে এবং পিতার মুখে সে বেদনার ছায়াও দেখতে চায় না। তাই অনেকদিন আগে কিনে দেওয়া জামা যা অনেকবার রিফু করে সে পরেছিল সেটা যে আর পরার অযোগ্য, তা জানায় না পিতাকে। বরং ঠাণ্ডাকেই সে অস্বীকার করে, বলে- “কই শীত, তেমন তো… “
প্রতিবেশী খেঁদীর বাড়িতে ক্ষীর দিয়ে পাটিসাপটা তৈরী হয় কিন্তু নিজেদের বাড়িতে ক্ষীর নেই বলে মেঝোবোন পুটি আক্ষেপ প্রকাশ করলে ক্ষেন্তি তাকে স্বান্তনা দিতে গিয়ে বলে- “পাটিসাপটায় ক্ষীর দিলে ছাই হয় খেতে। “
যে মেয়েটি প্রতিবেশীর ফেলে দেওয়া পাকা পুঁইয়ের ডাটা কুড়িয়ে আনে খাওয়ার জন্য, আগামী দিনে ফল-ফুলে ভরে উঠবে এই স্বপ্ন নিয়ে শীতকালেই পুঁইয়ের চারা রোপন করে, তাকে বিয়ে দিয়ে অন্যের ঘরে পাঠানোর ব্যাপারে সংশয় ছিল পিতা সহায়হরির মনে। কিন্তু বিয়ে না দেওয়া যে একটা অনাচার এবং সেটা সমাজ সহ্য করবে না, একঘরে করে দেওয়া হবে সহায়হরির পরিবারকে, সমাজের মজলিসে এটা জানিয়ে দেওয়া হয় সহায়হরিকে। সুতরাং সমাজের চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে হয় সহায়হরিকে। অর্থপণ সহ কন্যাদান করেন সহায়হরি। অবশ্য পণের পুরো অর্থ দিতে পারেননি তিনি, বাকি রয়ে গিয়েছিল আড়াইশো টাকার মতো। যা শোধ করতে হয় ক্ষেন্তিকে, বিবাহিত জীবনের এক বছরের মাথায় নিজের প্রাণ দিয়ে। সহায়হরি মেয়েকে শেষ দেখার সুযোগটুকুও পাননি। জটিল, কঠিন ও বস্তুবাদী মানসিকতার সামনে পরাস্ত হয় হৃদয়ের সারল্য। ক্ষেন্তি রক্ষা করতে পারে না নিজেকে।
মৃত্যুর কাছে ক্ষেন্তিকে হার মানতে হয়েছিল কিন্তু তার স্বপ্ন হার মানেনি। যে স্বপ্ন সে দেখেছিল এক রুক্ষ্ম-শুষ্ক শীতের সকালে, সকলের অজান্তে প্রকৃতির বুকে পালিত হচ্ছিল তা। প্রকৃতি নিরাশ করেনি ক্ষেন্তিকে, তাই দেখা যায়-“…বাড়ির সেই লোভী মেয়েটির লোভের স্মৃতি পাতায় পাতায় শিরায় শিরায় জড়াইয়া তাহার কত সাধের নিজের হাতে পোতা পুঁই গাছটি মাচা জুড়িয়া বাড়িয়া উঠিয়াছে… বর্ষার জল ও কার্ত্তিক মাসের শিশির লইয়া কচিকাঁচা সবুজ ডগাগুলি মাচাতে সব ধরে নাই, মাচা হইতে বাহির হইয়া দুলিতেছে… সুপুষ্টু, নধর, প্রবর্ধমান জীবনের লাবণ্যে ভরপুর। “
